বাংলার চোখ | নরসিংদীর রায়পুরার মামুন সংসার চালাতে পিঠা বিক্রি করছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র
  1. [email protected] : mainadmin :
বাংলার চোখ | নরসিংদীর রায়পুরার মামুন সংসার চালাতে পিঠা বিক্রি করছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র
শনিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ০১:১৭ অপরাহ্ন

নরসিংদীর রায়পুরার মামুন সংসার চালাতে পিঠা বিক্রি করছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র

বাংলার চোখ সংবাদ
  • সময় সোমবার, ২২ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
  • ৯৮ দেখেছেন

ভ্রাম্যমান প্রতিনিধি:

নরসিংদীর রায়পুরায় বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীর কথা আজ বলবো। যার জীবনের গল্প রূপকথার গল্পকে হার মানায়। অনেক শিক্ষার্থীরই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেতে কতটাই না কষ্ট করতে হয়। অন্যদিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে অধম্য মেধাবী ছাত্র মামুন মিয়া।

নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলায় মুছাপুর ইউনিয়নের মুছাপুর গ্রামের আমির হামজা (৫০) ও মনোয়ারা বেগমের ছেলে মামুন। ৪ ভাই ও ১ বোনের মধ্যে সে দ্বিতীয়। আমির হামজা ও মনোয়ারার সংসারে অভাব অনটন নিত্যদিনের সঙ্গী। জীবনযুদ্ধ কি জিনিস তা মামুন ও ভাই-বোনরা দেখে এসেছে জন্মলগ্ন থেকে। মামুনের সাথে কথা হলে সে বলে, ‘ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছি বাবা সকাল-বিকাল পিঠা বিক্রি করে সংসার চালিয়েছেন। কত কষ্ট আমাদের জন্য করেছেন। মা সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনির মাধ্যমে সংসারটিকে আগলে রেখেছেন। দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকে বাবার সাথে স্কুল ছুটির পর প্রতিদিন পিঠা বিক্রিতে সহযোগিতা করতাম। তখন পিঠা বানাতে পারতাম না, বাবা বানিয়ে দিলে আমি মানুষের হাতে হাতে তুলে দিতাম। একটু বড় হওয়ার সাথে সাথে নিজেই পিঠা বানানো শুরু করি। আমাদের সংসারে একটু একটু করে অভাব অনটন দূর হতে থাকে। ছোটবেলায় অভাবের সংসার হওয়ায় লেখাপড়ায় বেশি মনোযোগ দিতে পারিনি। প্রথমে মুছাপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণী থেকে ২০১০ সালে উত্তীর্ণ হয়ে মেধা বৃত্তি লাভ করে ৬ষ্ট শ্রেণীতে মাহমুদাবাদ রাজিউদ্দিন আহাম্মদ রাজু উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হই। অষ্টম শ্রেণিতে ২০১৩ সালে এপ্লাসে উত্তীর্ণ হই। বাবা রেজাল্ট সম্পর্কে পুরোপুরি বুঝতে না পারলেও, মানুষ কাছ থেকে শুনে শুনে বুঝতে পারলেন, আমি তো ভালো ছাত্র, একটু মনোযোগ দিয়ে যেন লেখাপড়াটা করি। মা আমাকে সব সময় পড়াশোনার জন্য উৎসাহ দিতেন। মেধা ভালো হওয়ায় স্কুলের স্যারদের পরামর্শে বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে ৯ম শ্রেণীতে ভর্তি হই। সংসারের অভাব অনটন দেখে অনেক শিক্ষক আমাকে ফ্রিতে প্রাইভেট পড়িয়েছেন। তারপর ঐ স্কুল থেকে বিজ্ঞান বিভাগে ২০১৬ সালের এস এস সি পরীক্ষায় জিপি এ-৫ পাই।

তার স্কুলের শিক্ষক মোঃ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘মেধাবী ছাত্র ছিলো সে। অভাবের সংসার হওয়ায় ফ্রীতেই পড়াতাম সব সময়। যেকোন পরামর্শ দিলে মেনে চলতো। সে যেন অনেক বড় হয়, দোয়া করি। ’

মাহমুদাবাদ রাজিউদ্দিন আহাম্মদ রাজু উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফারুক মিয়া জানান, ‘অদম্য মেধাবী ছাত্র এই মামুন। দারিদ্রতা থামাতে পারেনি তাকে। আমি বিশ্বাস করি, সকলের মুখ উজ্জ্বল করবে সে একদিন। ’

এইচ.এস.সিতে আর্থিক সামর্থ্যবান না হওয়ায় ভালো কলেজে ভর্তি হতে চেয়েও পারেনি মামুন। পাশের এলাকা কিশোরগঞ্জের ভৈরবে হাজী আসমত কলেজে পড়াশোনা করে বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে ২০১৯ সালে জি.পি.এ ৪.৫০ গ্রেড লাভ করে সে। শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরিক্ষা যুদ্ধ। শেষ পর্যন্ত কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে ১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে সুযোগ পেয়ে ভর্তি হয় আমাদের মামুন। কলেজে পড়াকালিন সময় বৃত্তির জন্য আবেদন করেছিলেন বিভিন্ন ব্যাংকে। কিন্তু গোল্ডেন এ প্লাস না থাকার কারণে বৃত্তি পাওয়া হয়ে উঠেনি মামুনের।

মামুন আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হওয়ার অল্প কিছু দিন ক্লাস করার পর করোনা কালীন সময়ে বাড়িতে চলে আসি। দুই বেলা পিঠা বিক্রি করে সংসার চালানো জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু হলে কি করে চলবে বুঝতে পারছি না। বাবার বয়স হয়েছে, এখন আর আগের মত কাজ করতে পারেন না। আগুনের সামনে সারাক্ষণ বসে থাকতে পারেন না। আমি কুমিল্লা চলে গেলে সংসার কিভাবে চলবে, নিজের খরচ কিভাবে চালাবো কিছুই বুঝতে পারছি না। মামুনের মায়ের চিন্তা ছিল কীভাবে সন্তানকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি করাবে, কিভবে পড়ার খরচ যোগাড় করবে। নিজের কঠোর চেষ্টায় একহাতে সংসারের উপার্জন, অন্যদিকে পড়াশোনা। জীবনসংগ্রামে হার নামানা মামুন আজ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির টাকাও তাঁর পরিবার দিতে খুব কষ্ট হয়েছে। পিঠা বিক্রি করে সংসার চালানোর পর ও কিছু জমানো টাকা দিয়ে ভর্তি পরীক্ষার এবং আসা-যাওয়ার খরচ জুগিয়েছেন। মামুনের বাবার সাথে কথা হয় আমাদের, কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ছোট সময় পরীক্ষা দিতে পারছিল না টাকার অভাবে। তার আগ্রহ দেখে ঘর থেকে ডিম পাড়া মুরগী বাজারে বিক্রি করে টাকাটা তার হাতে তুলে দিয়ে ছিলাম তার হাতে। ডিম পাড়া মুরগী বিক্রি না করতে বার বার বললেও আমি বলে ছিলাম, ছেলে মানুষের মত মানুষ হলে কত কি কেনা যাবে’ এই বলে হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন মামুনের বাবা আমির হামজা। না, এ কান্না শুধু কষ্টেরই নয়, আনন্দেরও বটে। ছেলে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে, উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে। তিনি চোখ মুছতে মুছুতে আবার বলতে শুরু করেন, ‘ছোট তরকারির দোকানে তরকারি বিক্রি করে এবং ধার দেনা করে কিছু টাকার ব্যবস্থা করে ছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির সময়। আমার ছেলে নিজের ইচ্ছা শক্তি থেকে লেখাপড়া চালিয়েছে। মানুষের মত মানুষ হয়ে দেশ উজ্জ্বল করবে ইনশাল্লাহ।তার জন্য সকলের নিকট দোয়া চাই। সে যেন বড় কিছু হয়ে দশের কাজে লাগে, দেশের কাজে লাগে। ’

মুছাপুর ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের জয়নাল মেম্বার বলেন, ‘মামুন সকলের গর্ব। সে পিঠা বিক্রি করে সংসার ও পড়াশোনা চালিয়েছে। শুনলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে, দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে। সকলে এমন মেধাবী ছাত্র কে সহযোগিতায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি।

মামুন চায় বাবার স্বপ্ন পূর্ণ করতে। দেশের ও দশের জন্য কিছু করতে। তার জীবনে স্কুল-কলেজের শিক্ষকসহ অনেকের সহযোগিতা ও দোয়া রয়েছে। এই ভালোবাসার মানুষগুলোর নিঃস্বার্থ ভালোবাসার সিক্ত হয়ে নিজ কর্মের মাধ্যমে এলাকার ও দেশের উন্নয়নে কাজ করে যেতে। নিশ্চয়ই এই অদম্য মামুন মিয়া একদিন দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে।

জীবনযুদ্ধের এ সংগ্রামী যোদ্ধা তার মেধা, জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে উজ্জ¦ল জীবনের অধিকারী হোক, সমাজের সকলের জন্য অনুকরণীয় হোক।

সামাজিক মাধ্যমগুলোতে শেয়ার করুন...

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও খবর...
© All rights reserved © 2021 www.banglarchokhnews.com  
Theme Customized BY LatestNews